Thursday, June 08, 2006

লাল্লু রাজার যুদ্ধযাত্রা

লাল্লু রাজার যুদ্ধযাত্রা
                   - কমলেশ পাল
 
 
লোকে তাকে ডাকত লাল্লুরাজা৷ শুনলে সে খুশি হত ৷
তার তোবড়ানো মেঘলা মুখে ছড়িয়ে পড়ত এক ঝলক ফোকলা
হাসির রোদ্দুর ৷ অবশ্য আড়ালে তাকে বলতুম - লাল্লু চামার ৷
কেউ বলত - লাল্লু বুড়ো ৷

ভাঙা রাজবাড়ির সিংদরজায় বিছানো থাকত তার ছেঁড়া চটের
"রাজগদ্দি"৷ তার সামনে, ডাইনে, বাঁয়ে জড়ো হত ফাঁটা চটি
ছেঁড়া জুতো, উলটানো চপ্পলের ভিড় ৷ থাকত তাদের একশ আট
রকমের বায়নাক্কা, একশ আট রকমের অভিযোগ ৷
 
ছুঁচ দিয়ে সে সেলাই করে দিত ফাঁটা চটির কাটা ঘা ৷
চামড়া জুড়ে মুড়ে দিত ছেঁড়া জুতোর হাহাকার ৷ পেরেক ঠুকে সে
মজবুত করে দিত ওল্টানো চপ্পলের নড়বড়ে মেরুদণ্ড ৷ কালি
বুলিয়ে, বুরুশ ঘষে উজ্জ্বল করে তুলত তাদের মলিন মুখশ্রী ৷
তাদের গায়ে ঠুক্ ঠুক্ করে টোকা মেরে বলত : "যাও বাচ্চা,
আগে বাড়্ হো"৷ তারপর, সেইসব হেরে-যাওয়া জুতো, চপ্পল,
চটিরা আবার নতুন চটি, দামী জুতোদের মাঝখান দিয়ে
আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হেটে যেত ৷
 
ছেলেদের একটা মজা ছিল লাল্লুকে নিয়ে ৷ কেউ যদি বলত
-"লাল্লু, রাজবাড়িটা কার?" বুকে থাপ্পড় মেরে সে বলে উঠত
-"হামার, বাবু, হামার ৷"
 
সেই রাজবাড়ি আজ নিলাম হচ্ছে ৷ খদ্দেরে, দালালে, দর্শকে
গিজগিজ করছে ভিতরের প্রাঙ্গণ ৷ দালালের হাঁকে উড়ে যাচ্ছে
গোলা পায়রার ঝাঁক - উড়ে যাচ্ছে রাজবাড়ির পুরনো দিনের গল্প
ঝুরঝুর করে খসে পড়ছে কার্নিশ থেকে বালি - ঝরে পড়ছে
সামন্ত যুগের আভিজাত্য ৷
 
রাজবাড়ি নিলাম হচ্ছে ... লাল্লুবুড়ো তার রাজগদ্দি ঘাড়ে করে
চলে যাচ্ছে৷ বললুম : কি হে, রাজ্যপাট নিয়ে চল্লে কোথায়?
সে গম্ভীর ভাবে বলল : মকান পুরানা ছিল, ছোড়ে দিলাম ৷
হুই ..... পঁচ্চিশ তল্লা মকানের দখ্খল লিব ৷
 
শহরের সবচাইতে উঁচু বাড়িটার দিকে সে উঁচিয়ে ধরল
তার তর্জনী ৷ তার শীর্ণ লম্বা আঙুল মনে হচ্ছে যেন বন্দুকের নল ৷
তার দুটো লাল চোখ মনে হচ্ছে যেন বারুদ-ভরা টোটা ৷
লাল্লুরাজা যুদ্ধে চলেছে ৷

0 Comments:

Post a Comment

<< Home