Thursday, June 08, 2006

পাপগাথা


পাপগাথা
- কমলেশ পাল

ছড়ানো একান্ন পীঠে তুমি সতীমাতা
গুটাও পৃথুলা পূণ্য, রাখি পাপ-গাথা ৷
এ বোঝা একার নয়, সকলের দায়
অনুভব তুলে দিল আমার মাথায় ৷
সরো সতী ভাগ্যবতী শিব-সোহাগিনী
নামাই দুর্ভার এই কলঙ্ক-কাহিনী ৷

***


একটি মেয়ে শ্যামলা সরল করত শিবের ব্রত
শরীর ভরা জোয়ার তবু কুমারী অক্ষত ৷
ভিতরে এক রত্তি ছিল সুপ্ত মায়ের কুঁড়ি
স্বপ্নে ছিল অচিন যুবক পরাবে অঙ্গুরি ৷
নাম জানে না ধাম জানে না স্বপ্নে আসে যায়
দেহের কোটাল ফুরায় বুঝি দিন কাটে শঙ্কায় ৷
শিব-যামিনী চতুর্দশী রয় উপোসী মেয়ে
ভোলানাথের থেকে নিল একটি বর চেয়ে ৷

***


সেই বর এলো গোধূলি ভাসানো ইমনে
বর হয়ে এলো পুরুষ নারীর জীবনে ৷
মুখ তুলে চাও, ও মেয়ে ডাগর নয়না
খসাও কপট পানপাতা-ঢাকা ছলনা ৷

***


সালঙ্কারা কন্যা দেখে বর
সাত-পা হাঁটে বরের পিছু পিছু ৷
বরের সাথে মেলাতে অন্তর
আকাশ হল ঘাসের চেয়ে নিচু ৷
নতুন অনুভূতির ছোঁয়া আজ
পরুষ হাতে ধরা পেলব কর ৷
অনলে ঢালে আহুতি লঘু লাজ
মন্ত্র তার গহীন গাঢ় স্বর ৷

***


বেদে নাই, শাস্ত্রে নাই
নাই পুরোহিত-দর্পণে
সেই মন্ত্র বলে কন্যা
নিজের মনে মনে ৷

যে মন্ত্র পেয়েছে কন্যা
পুতুলের খেলায়
যে মন্ত্র পেয়েছে কন্যা
ব্রতে অনশনে
যে মন্ত্র পেলেছে কন্যা
আঁচলের তলায়
সেই মন্ত্র বলে কন্যা
নিজের মনে মনে .......

- "ধাইন্য কুসুম, ধাইন্য কুসুম
ধাইন্য কুসুম খই
অগ্নি সহবাসে থাইকো
যাবজ্জীবন সই ৷ "

***
স্বামী সহবাসে যাবে কন্যা গুণবতী
ছিঁড়িতে নাড়ির গ্রন্থি কাতর যুবতী ৷
পিছনে ফিরিয়া কন্যা মায়ের আঁচলে
কাঁদিতে কাঁদিতে চাল দিল ছুঁড়ে ফেলে ৷
"জন্ম-ঋণ-শোধ" শুনে মাতা মুর্ছা যায়
কেঁদে কন্যা জনকের চরণ ভাসায় ৷
ভাই কান্দে, ভগ্নী কান্দে, কান্দে পরিজন
আজন্মের স্মৃতি কান্দে দিতে বিসর্জন ৷
সিঁথিতে রক্তিম নদী, চন্দন কপালে
অচিন সাগরে ডিঙি গেল সন্ধ্যাকালে ৷

***
নগর-সরণি আজ উজান নদীটি
দুপাশের আলোজ্বলা বহুতল বাড়ি ও বাজার
এ মুহূর্তে জোনাকি-মানিক-গাঁথা হিজল পারুল -
মারুতি ময়ুরপঙ্খী - কোলাহল ভাটিয়ালী গান৷
সৌরভ সৌরভ লাগে, পাশে আছে স্বপ্নের পুরুষ
ক্যালেণ্ডার যা বলে বলুক - আজ তিথি দোলনিশি -
চাঁদনীর মুখে মাখা আবিরের ভালোবাসাবাসি -
নদীর মোহনা সরে যাও !

তবু যাত্রা শেষ হয় ৷ গাড়ি ভেড়ে তটে ৷
নতুন সংসার তটে আলো, ভিড়, বরণের উলু ........

***


ফিরেছে শিকার করে বরণের ডালি সাজা
এনেছে সোনার মৃগ উলু দে, শঙ্খ বাজা ৷
মেপে নে সোনার তবক ক'কেজি মাংস হবে
বধু, কাল-রাত্রি তোমার এ শুরু সন্ধ্যা সবে ৷
আমাদের পোশাক ভাষা টেনে নেয় নৃত্য আদিম
বাড়ি-ঘর অন্ধ গুহা পিশাচের বাজনা দ্রিদিম্ ৷
ছোপানো ঠোঁটের খাপে ধারালো দাঁতের ছুরি
বধূ তোর মেদের সাথে চাই মদ টাকার ঝুড়ি ৷

***


তারপর প্রতিরাত্রে অর্থহীন শরীর মন্থন ৷
প্রেমের অমৃত নয়, ওঠে শুধু বিষ ৷
স্বামীত্বের বলাত্কার মূল্য চায় প্রতিটি আঘাতে ৷

ভালোবাসা হাঁসের পালক
রাতভর কুকুরের আহারের পর
রক্তমাখা পড়ে থাকে বিছানার জঙ্গলের পাশে ৷

তবু বধু স্বপ্ন দ্যাখে -
অপরাহ্নে বাঁধে চুল, চোখে টানে মোহিনী-কাজল ৷
বাদল ঘনায় ঘোর, বধু হাঁস খোঁজে ..........

***


খুঁজিয়া না পান হংস পতির সংসারে
খুঁজিতে খুঁজিতে গেলা কৈলাস নগরে ৷
কপাটে কুটিলা মাথা জাগাতে বিধাতা
কন্যা দেখে আবির্ভূত শিব তার পিতা ৷
হাহাকার করে কন্যা - "কার হস্তে দিলা
কলসী বান্ধিয়া কন্ঠে জলে ভাসাইলা !"
বলে, সব বার্তা রাখি পিতার সাক্ষা‍‌ত্
"এ বর ফিরায়ে লও বাবা ভোলানাথ ৷
মোছাও সিঁথির রক্ত - বিবাহ কৌতুক
নয়, কন্যাযজ্ঞে ঢালো অনন্ত যৌতুক ৷"

***

বড় পাপকথা বলেছ, রমণী !
সিঁদূর সতীর চিহ্ন - বল্লভের আয়ুর কামনা -
তুমি তাকে মুছে দিতে চাও? মনে মনে তুমি হত্যাকারী !

কন্যাদান মহাদান, যৌতুক দক্ষিণা ৷
ধর্ম তুমি জানো না সম্যক ৷
জানে মনু প্রজাপতি, জানে অগ্নি - সাক্ষী বিবাহের ৷
স্বামীর যদৃচ্ছাতন্ত্রে মুখ ফুটে চেয়েছ অঙ্কুশ -
বড় পাপকথা বলেছ, রমণী !

***


বধূ তখন তার বিবাহের মন্ত্র স্মরণ করে ৷
প্রথম সাক্ষী প্রজাপতি ঋষিকেই সে ধরে ৷
পতির দলের প্রজাপতি সাক্ষী দিল না -
"নারী নরক যাওয়ার দুয়ার, দূর হয়ে তুই যা ৷"

***


যেতে যেতে যেতে যেতে ........
নখের মতো সরু আশার চন্দ্রকলা মরে;
অন্ধকারের সে অত্যাচার মুষল-ধারায় ঝরে ৷
ঘৃণার পাকে টলে কন্যা, চলতে সে অক্ষম
শেষ হতে চায় নিজেই নিজে, স্বামীও তার যম ৷

***


একদিন এমন সময়ে কেরোসিন, যজ্ঞের ঋত্বিক,
তরল করুণা হয়ে এলো তার কাছে ৷
স্বপ্নহীন শুষ্ক দাহ্য সমিধ-রমণী
প্রশ্ন করে তাকে :
"কোথায় দ্বিতীয় সাক্ষী?
আমার তো বিবাহ বৈদিক -
বেদান্ত মিথ্যা নয়,
উপস্থিত হোন তিনি -
বিবাহের শেষ সাক্ষী উপস্থিত হোন অগ্নিদেব !"

***


মন্ত্র সত্য, মন্ত্র সত্য, সর্বসত্য সতীর প্রার্থনা -
দীপশলাকার মুখে দেখা দিল জ্যোতির্ময় ফণা !
স্বামীর ধর্ষিতা নারী আজও মনে ব্রতের কুমারী,
দেহে তার রতি-তৃষ্ণা, আগুনেরও লেলিহান কাম
সর্বাঙ্গে জড়িয়ে ধরে, আগুন জড়িয়ে ধরে নাচে ...........

***


"স্বৈরিণী ছুঁড়ে লজ্জা
করে আগুনের সাথে সঙ্গম ৷
আগুনের চুমা সারা গায়ে
আগুনের চুমা ওঁ ওঁ ৷

করে চিত্কার, না কি শিত্কার
পুড়ে পুড়ে দেয় ধিত্কার:
"ধরে থাক খিল কব্জা
চাখ্ পোড়া মাস-মজ্জা ৷"

স্বৈরিণী করে সঙ্গম
আগুনের চুমা ওঁ ওঁ

***


হুতাশন উড়ায় হুতাশ ৷ আগুন বধুকে নেয় ৷
ত্বক নেয়, চক্ষু নেয়, ওষ্ঠ বুক হৃদ দেহ নেয় ৷
হয়তো নারীর দু:খ স্মৃতি সুখ ভালোবাসা নেয় ৷
নেয় না সোনার চুড়ি, ঝুটা-মোতি দুটি কানফুল ৷
আগুন নেয় না নাভি, ফেলে যায় পাপের স্মারক ৷

***


যে অঙ্গ ভোগের শুধু অধিকারী পতি
অগ্নিকে তা দিয়ে কন্যা হইলা অসতী ৷
বাতাস নিল না ভস্ম, নেয় নাকো বারি
সীসার ওজন পাপ শিরে নিয়া ফিরি ৷
কার পাপ, ঠিকানা কি, জানি না তো নাম
সরো বা না-সরো সতী, আমি নামালাম ৷

***


"কী কব কষ্টের কথা, কারে বা জানাই -
মনুষ্য বধির অন্ধ, কাষ্ঠের সেপাই৷"
পোড়ালে জিয়ন্ত নারী, রটে পুণ্যকথা -
ছড়িয়ে বাহান্ন পীঠ কাঁদে নির্যাতিতা ৷

0 Comments:

Post a Comment

<< Home